মানব রেচন ও নিষ্কাশন
মানব রেচনতন্ত্রের গঠন
বিপাকের ফলে সৃষ্ট নাইট্রোজেনঘটিত ও অন্যান্য বর্জ্য দেহ থেকে বের করার প্রক্রিয়াই রেচন, আর এর প্রধান তন্ত্র রেচনতন্ত্র। এটি গঠিত হয় এক জোড়া বৃক্ক (কিডনি — মূল রেচন অঙ্গ), এক জোড়া গবিনী বা ইউরেটার (বৃক্ক থেকে মূত্র বহন করে), একটি মূত্রথলি (মূত্র সাময়িক জমা রাখে) ও একটি মূত্রনালি (ইউরেথ্রা — দেহের বাইরে মূত্র নিষ্কাশন করে)। বৃক্ক রক্ত পরিশ্রুত করে মূত্র তৈরি করে এবং দেহের পানি-লবণ ভারসাম্য ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। বৃক্কের বাইরের কর্টেক্স ও ভেতরের মেডালা অঞ্চল থাকে।
রেচনতন্ত্র: বৃক্ক, ইউরেটার, মূত্রথলি, ইউরেথ্রা
বৃক্ক = প্রধান রেচন অঙ্গ (রক্ত পরিশ্রুত করে)
ইউরেটার মূত্র বহন করে, মূত্রথলি জমা রাখে
বৃক্কের বাইরে কর্টেক্স, ভেতরে মেডালা
পরীক্ষায় যেভাবে আসে
বৃক্ক মূত্র তৈরি করে, মূত্রথলি শুধু জমা রাখে — কাজ গুলিয়ে ফেলা হয়। ইউরেটার (বহন) ও ইউরেথ্রা (নিষ্কাশন) আলাদা।
এখানে ভুল হয় (৩)
- ·মূত্রথলিকে মূত্র-উৎপাদক ভাবা — বৃক্ক উৎপাদন করে
- ·ইউরেটার ও ইউরেথ্রাকে একই ভাবা — বহন বনাম নিষ্কাশন
- ·ফুসফুস/ত্বককে রেচনে ভূমিকাহীন ভাবা — এরাও সহায়ক রেচন অঙ্গ
মানব রেচন ও নিষ্কাশন
বৃক্ক বিকল ও ডায়ালাইসিস
বিভিন্ন কারণে বৃক্ক ঠিকমতো রক্ত পরিশ্রুত করতে ব্যর্থ হলে তাকে বৃক্ক বিকল বলে; এতে রক্তে ইউরিয়া ও বর্জ্য জমে, পানি-লবণ ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং ফুলে যাওয়া, বমি, ক্লান্তি দেখা দেয়। বৃক্ক বিকল হলে কৃত্রিম উপায়ে রক্ত পরিশোধন করা হয় ডায়ালাইসিসের মাধ্যমে। হিমোডায়ালাইসিসে রোগীর রক্ত যন্ত্রের অর্ধভেদ্য পর্দার মধ্য দিয়ে চালিয়ে ডায়ালাইসিস তরলে বর্জ্য ব্যাপনে সরিয়ে বিশুদ্ধ রক্ত ফেরত দেওয়া হয়; পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিসে উদর-গহ্বরের পেরিটোনিয়াম পর্দাকে ছাঁকনি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। স্থায়ী সমাধানে সুস্থ দাতার বৃক্ক প্রতিস্থাপন (কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট) করা হয়।
বৃক্ক বিকল: রক্তে ইউরিয়া/বর্জ্য জমা, ভারসাম্য নষ্ট
ডায়ালাইসিস = কৃত্রিম রক্ত পরিশোধন
হিমোডায়ালাইসিস (যন্ত্রের পর্দা) ও পেরিটোনিয়াল (উদর পর্দা)
স্থায়ী সমাধান: বৃক্ক প্রতিস্থাপন
পরীক্ষায় যেভাবে আসে
ডায়ালাইসিস অর্ধভেদ্য পর্দায় ব্যাপন নীতিতে কাজ করে — নেফ্রনের কাজের কৃত্রিম প্রতিরূপ। স্থায়ী সমাধান প্রতিস্থাপন।
এখানে ভুল হয় (৩)
- ·ডায়ালাইসিসকে স্থায়ী নিরাময় ভাবা — অস্থায়ী; প্রতিস্থাপন স্থায়ী
- ·ডায়ালাইসিসকে সক্রিয় পরিবহন ভাবা — ব্যাপন
- ·বৃক্ক বিকলে ইউরিয়া কমে ভাবা — রক্তে জমে বাড়ে
মানব রেচন ও নিষ্কাশন
বৃক্কের অসমোরেগুলেশন ও pH নিয়ন্ত্রণ ভূমিকা
বৃক্ক কেবল বর্জ্য নিষ্কাশন করে না, দেহের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা (হোমিওস্টেসিস) রক্ষায়ও কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখে। অসমোরেগুলেশনে বৃক্ক দেহের পানি ও লবণের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে — অতিরিক্ত পানি থাকলে পাতলা বেশি মূত্র, পানিস্বল্পতায় ঘন কম মূত্র তৈরি করে; এতে হরমোন ADH (ভ্যাসোপ্রেসিন) নালিকায় পানি পুনঃশোষণ বাড়িয়ে সাহায্য করে। এছাড়া বৃক্ক রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা (অ্যালডোস্টেরন হরমোনের সাহায্যে) ও রক্তের pH (H⁺ ও বাইকার্বনেট নিয়ন্ত্রণ করে) স্থির রাখে এবং রেনিন ক্ষরণে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে অংশ নেয়।
অসমোরেগুলেশন: পানি-লবণ ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ
ADH নালিকায় পানি পুনঃশোষণ বাড়ায় (ঘন মূত্র)
অ্যালডোস্টেরন সোডিয়াম নিয়ন্ত্রণ করে
বৃক্ক রক্তের pH ও রক্তচাপও নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে
পরীক্ষায় যেভাবে আসে
ADH বেশি হলে পানি বেশি পুনঃশোষিত হয়ে ঘন/কম মূত্র হয় — ADH ও মূত্রের ঘনত্বের সম্পর্ক প্রিয় প্রশ্ন।
এখানে ভুল হয় (৩)
- ·ADH বাড়লে মূত্র পাতলা/বেশি হয় ভাবা — ঘন/কম হয়
- ·বৃক্ককে শুধু বর্জ্য-নিষ্কাশক ভাবা — হোমিওস্টেসিসেও কেন্দ্রীয়
- ·pH নিয়ন্ত্রণকে ফুসফুসের একক কাজ ভাবা — বৃক্কও করে
মানব রেচন ও নিষ্কাশন
বৃক্কের গঠন ও নেফ্রন
নেফ্রন হলো বৃক্কের গঠনগত ও কার্যগত একক; প্রতিটি বৃক্কে প্রায় দশ লক্ষ নেফ্রন থাকে ও এরাই মূত্র তৈরি করে। প্রতিটি নেফ্রনের দুটি প্রধান অংশ: রেনাল করপাসল (ম্যালপিজিয়ান বডি) — যাতে কৈশিকজালক গ্লোমেরুলাস ও তাকে ঘিরে বোম্যান্স ক্যাপসুল থাকে; এবং বৃক্কীয় নালিকা — প্রক্সিমাল প্যাঁচানো নালিকা, হেনলির লুপ, ডিস্টাল প্যাঁচানো নালিকা ও সংগ্রাহক নালিকা। গ্লোমেরুলাসে রক্ত পরিস্রুত হয় এবং নালিকা বেয়ে যাওয়ার সময় প্রয়োজনীয় উপাদান পুনঃশোষিত ও বর্জ্য ক্ষরিত হয়ে মূত্র তৈরি হয়।
নেফ্রন = বৃক্কের গঠন ও কার্যগত একক (~১০ লক্ষ/বৃক্ক)
রেনাল করপাসল = গ্লোমেরুলাস + বোম্যান্স ক্যাপসুল
নালিকা: প্রক্সিমাল → হেনলির লুপ → ডিস্টাল → সংগ্রাহক
গ্লোমেরুলাসে পরিস্রাবণ ঘটে
পরীক্ষায় যেভাবে আসে
নেফ্রন বৃক্কের একক (বৃক্ক নয়) — এককের নাম প্রায়ই জিজ্ঞাসিত। পরিস্রাবণ ঘটে গ্লোমেরুলাসে।
এখানে ভুল হয় (৩)
- ·বৃক্ককে রেচনের একক ভাবা — নেফ্রন একক
- ·পরিস্রাবণকে নালিকায় ভাবা — গ্লোমেরুলাসে
- ·বোম্যান্স ক্যাপসুলকে রক্তনালি ভাবা — পরিস্রুত তরল সংগ্রাহক
মানব রেচন ও নিষ্কাশন
নাইট্রোজেনঘটিত বর্জ্য
আমিষ ও নিউক্লিক অ্যাসিডের বিপাকে সৃষ্ট নাইট্রোজেনঘটিত বর্জ্য দেহের প্রধান রেচন পদার্থ। এদের তিন প্রধান রূপ: অ্যামোনিয়া (অত্যন্ত বিষাক্ত, বেশি পানি লাগে — জলজ প্রাণীতে), ইউরিয়া (কম বিষাক্ত, মাঝারি পানি লাগে — স্তন্যপায়ী ও মানুষে) এবং ইউরিক অ্যাসিড (প্রায় নির্বিষ, খুব কম পানি লাগে — পাখি, সরীসৃপ, পতঙ্গে)। মানুষে যকৃতে বিষাক্ত অ্যামোনিয়া ইউরিয়া চক্রের মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ইউরিয়ায় রূপান্তরিত হয় এবং বৃক্ক দিয়ে মূত্রে নিষ্কাশিত হয়। যে প্রাণী প্রধানত ইউরিয়া নিষ্কাশন করে তাকে ইউরিওটেলিক বলে।
তিন রূপ: অ্যামোনিয়া (বিষাক্ত), ইউরিয়া (কম বিষাক্ত), ইউরিক অ্যাসিড (নির্বিষ)
মানুষ ইউরিওটেলিক (প্রধানত ইউরিয়া নিষ্কাশন করে)
যকৃতে অ্যামোনিয়া → ইউরিয়া (ইউরিয়া চক্র)
ইউরিক অ্যাসিডে সবচেয়ে কম পানি লাগে (পাখি/সরীসৃপ)
পরীক্ষায় যেভাবে আসে
ইউরিয়া তৈরি হয় যকৃতে (বৃক্কে নয়), বৃক্ক শুধু নিষ্কাশন করে — প্রিয় ফাঁদ। মানুষ ইউরিওটেলিক।
এখানে ভুল হয় (৩)
- ·ইউরিয়া বৃক্কে তৈরি ভাবা — যকৃতে তৈরি
- ·অ্যামোনিয়াকে নির্বিষ ভাবা — সবচেয়ে বিষাক্ত
- ·মানুষকে ইউরিকোটেলিক ভাবা — ইউরিওটেলিক
The ornithine cycle and nitrogenous waste
অর্নিথিন চক্র ও নাইট্রোজেনঘটিত বর্জ্য
প্রোটিন ভাঙার সময় অ্যামিনো গ্রুপ আলাদা হয়ে অ্যামোনিয়া তৈরি করে, আর অ্যামোনিয়া অত্যন্ত বিষাক্ত — অল্প ঘনত্বেও কোষের ক্ষতি করে। যকৃত সেই অ্যামোনিয়াকে কার্বন ডাইঅক্সাইডের সঙ্গে যুক্ত করে অনেক কম বিষাক্ত ইউরিয়ায় পরিণত করে, আর এই ধারাবাহিক বিক্রিয়াকেই বলে অর্নিথিন চক্র বা ইউরিয়া চক্র। চক্র বলা হয় কারণ শুরুর যৌগ অর্নিথিন শেষে আবার ফিরে আসে এবং পরের চক্র চালাতে পারে। জরুরি ভাগ — ইউরিয়া তৈরি হয় যকৃতে, কিন্তু নিষ্কাশিত হয় বৃক্কে; প্রাণীদের বর্জ্যের ধরন নির্ভর করে পানির প্রাপ্যতার উপর।
অর্নিথিন চক্র ঘটে যকৃতে; ইউরিয়া নিষ্কাশিত হয় বৃক্কে
মূল বিক্রিয়া: 2NH₃ + CO₂ → ইউরিয়া + H₂O
চক্রের মধ্যবর্তী যৌগ: অর্নিথিন → সিট্রুলিন → আর্জিনিন → আবার অর্নিথিন
অ্যামোনোটেলিক প্রাণী অ্যামোনিয়া ত্যাগ করে (জলজ); ইউরিওটেলিক ইউরিয়া (স্তন্যপায়ী); ইউরিকোটেলিক ইউরিক অ্যাসিড (পাখি, সরীসৃপ)
অ্যামোনিয়া সবচেয়ে বিষাক্ত ও সবচেয়ে বেশি পানি লাগে; ইউরিক অ্যাসিড সবচেয়ে কম
মানুষ ইউরিওটেলিক
পরীক্ষায় যেভাবে আসে
ইউরিয়া তৈরি যকৃতে, নিষ্কাশন বৃক্কে — প্রশ্নে 'তৈরি' না 'নিষ্কাশন' কোনটি জিজ্ঞাসা করা হয়েছে পড়ো।
এখানে ভুল হয় (৩)
- ·ইউরিয়া বৃক্কে তৈরি হয় ধরা — বৃক্ক কেবল ছেঁকে বের করে
- ·অর্নিথিন চক্রকে ক্রেবস চক্রের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা
- ·মানুষকে ইউরিকোটেলিক ধরা — সেটি পাখি ও সরীসৃপ
মানব রেচন ও নিষ্কাশন
মূত্র তৈরির কৌশল
নেফ্রনে মূত্র তৈরি তিন ধাপে সম্পন্ন হয়। (১) পরিস্রাবণ: গ্লোমেরুলাসে উচ্চ চাপে রক্তের পানি, লবণ, গ্লুকোজ, ইউরিয়া প্রভৃতি ছোট অণু বোম্যান্স ক্যাপসুলে ছেঁকে যায় (রক্তকণিকা ও বড় প্রোটিন থেকে যায়) — একে গ্লোমেরুলার পরিস্রুত বলে। (২) নির্বাচিত পুনঃশোষণ: নালিকা বেয়ে যাওয়ার সময় দেহের প্রয়োজনীয় পদার্থ (সব গ্লুকোজ, বেশিরভাগ পানি ও লবণ) রক্তে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। (৩) নালিকীয় ক্ষরণ: অতিরিক্ত H⁺, K⁺ ও কিছু বর্জ্য রক্ত থেকে নালিকায় যোগ করা হয়। অবশিষ্ট ঘনীভূত তরলই মূত্র, যা সংগ্রাহক নালিকা দিয়ে বেরোয়।
তিন ধাপ: পরিস্রাবণ → পুনঃশোষণ → ক্ষরণ
পরিস্রাবণে রক্তকণিকা ও বড় প্রোটিন ছাঁকা হয় না
পুনঃশোষণে সব গ্লুকোজ ও বেশিরভাগ পানি ফেরত
স্বাভাবিক মূত্রে গ্লুকোজ থাকে না
পরীক্ষায় যেভাবে আসে
স্বাভাবিক মূত্রে গ্লুকোজ থাকে না (পুরোটা পুনঃশোষিত হয়) — মূত্রে গ্লুকোজ থাকা ডায়াবেটিসের লক্ষণ। প্রোটিন পরিস্রুত হয় না।
এখানে ভুল হয় (৩)
- ·মূত্রে গ্লুকোজ স্বাভাবিক ভাবা — থাকে না (সব পুনঃশোষিত)
- ·পরিস্রাবণে প্রোটিন ছাঁকা হয় ভাবা — বড় প্রোটিন থেকে যায়
- ·পুনঃশোষণকে বর্জ্য ফেরানো ভাবা — প্রয়োজনীয় পদার্থ ফেরানো