প্রাণীর আচরণ
মৌমাছির সামাজিক সংগঠন
মৌমাছি একটি উন্নত সামাজিক পতঙ্গ, যারা সুসংগঠিত কলোনিতে শ্রমবিভাজনসহ একত্রে বাস করে। কলোনিতে তিন ধরনের সদস্য (কাস্ট): একটি রানী (উর্বর স্ত্রী — একমাত্র ডিম পাড়ে, কলোনি নিয়ন্ত্রণ করে), কিছু পুরুষ বা ড্রোন (রানীর সাথে মিলনই একমাত্র কাজ) এবং অসংখ্য বন্ধ্যা স্ত্রী কর্মী মৌমাছি (worker — খাদ্য সংগ্রহ, মৌচাক নির্মাণ, লার্ভা পরিচর্যা, প্রতিরক্ষা করে)। কর্মী মৌমাছি ফুলের অবস্থান দলের অন্যদের জানাতে বিশেষ 'নৃত্য' (waggle dance) করে — এটি প্রাণীজগতের উল্লেখযোগ্য যোগাযোগ আচরণ। এই সামাজিক সংগঠন কলোনির টিকে থাকা ও দক্ষতা নিশ্চিত করে।
তিন কাস্ট: রানী (ডিম পাড়ে), ড্রোন (মিলন), কর্মী (সব কাজ)
কর্মী মৌমাছি বন্ধ্যা স্ত্রী; খাদ্য/চাক/পরিচর্যা/প্রতিরক্ষা করে
কর্মী নৃত্যের (waggle dance) মাধ্যমে ফুলের অবস্থান জানায়
শ্রমবিভাজনভিত্তিক উন্নত সামাজিক সংগঠন
পরীক্ষায় যেভাবে আসে
কর্মী মৌমাছি বন্ধ্যা স্ত্রী (পুরুষ নয়) — লিঙ্গ প্রায়ই গুলিয়ে ফেলা হয়। ড্রোন পুরুষ, একমাত্র কাজ মিলন।
এখানে ভুল হয় (৩)
- ·কর্মী মৌমাছিকে পুরুষ ভাবা — বন্ধ্যা স্ত্রী
- ·ড্রোনকে কর্মী ভাবা — পুরুষ (শুধু মিলন)
- ·রানীকে বহু থাকতে পারে ভাবা — একটিমাত্র রানী
প্রাণীর আচরণ
সহজাত আবেগ (ইনস্টিংক্ট)
ইনস্টিংক্ট বা সহজাত আবেগ হলো একটি জটিল, ধারাবাহিক ও জন্মগত আচরণ-ক্রম, যা কোনো নির্দিষ্ট উদ্দীপক (রিলিজার) দ্বারা সূচিত হয়ে না-শিখেই নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হয়; সমগ্র প্রজাতিতে এটি প্রায় অভিন্ন। উদাহরণ: টুনটুনি পাখির নিখুঁত বাসা বাঁধা, মাকড়শার জাল বোনা, শীতে পরিযায়ী পাখির হাজার কিলোমিটার পরিযান (মাইগ্রেশন) এবং অপত্যের প্রতি প্রাণীর যত্ন (parental care — যেমন স্টিকলব্যাক মাছের ডিম পাহারা)। এসব আচরণ শেখানো হয় না, বংশপরম্পরায় জিনে বাহিত হয়। ইনস্টিংক্ট প্রাণীর টিকে থাকা ও বংশরক্ষায় অভিযোজনিক ভূমিকা রাখে।
ইনস্টিংক্ট = জটিল, জন্মগত, রিলিজার-সূচিত আচরণ-ক্রম
প্রজাতির সব সদস্যে প্রায় অভিন্ন, শেখা লাগে না
উদাহরণ: বাসা বাঁধা, জাল বোনা, পরিযান, অপত্য পরিচর্যা
জিনে বাহিত; অভিযোজনিক গুরুত্বপূর্ণ
পরীক্ষায় যেভাবে আসে
ইনস্টিংক্ট জটিল কিন্তু জন্মগত (শেখা নয়) — এটাই ট্যাক্সিস/রিফ্লেক্স থেকে আলাদা করে জটিলতায়, শিখন থেকে আলাদা জন্মগত হওয়ায়।
এখানে ভুল হয় (৩)
- ·ইনস্টিংক্টকে শিখন আচরণ ভাবা — জন্মগত
- ·পরিযানকে শেখা আচরণ ভাবা — সহজাত ইনস্টিংক্ট
- ·ইনস্টিংক্টকে সরল প্রতিবর্ত ভাবা — জটিল আচরণ-ক্রম
প্রাণীর আচরণ
শিখন আচরণ ও প্যাভলভের সাপেক্ষণ
শিখন হলো অভিজ্ঞতা ও পরিবেশের সাথে মিথস্ক্রিয়ায় অর্জিত আচরণগত পরিবর্তন। এর সরলতম রূপ অভ্যাসগতকরণ (habituation) — বারবার নিরীহ উদ্দীপকে সাড়া ধীরে ধীরে কমে যাওয়া। উচ্চতর রূপ সাপেক্ষণ বা কন্ডিশনিং; ইভান প্যাভলভ কুকুরের ওপর পরীক্ষায় চিরায়ত সাপেক্ষণ (classical conditioning) দেখান — খাবার (স্বাভাবিক উদ্দীপক) দেখলে কুকুরের লালা আসে; বারবার খাবারের সাথে ঘণ্টাধ্বনি (নিরপেক্ষ উদ্দীপক) দিলে পরে শুধু ঘণ্টাধ্বনিতেই লালা আসে (সাপেক্ষ প্রতিবর্ত)। এভাবে একটি নিরপেক্ষ উদ্দীপক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সাড়া উদ্রেককারী হয়ে ওঠে।
শিখন = অভিজ্ঞতায় অর্জিত আচরণগত পরিবর্তন
অভ্যাসগতকরণ: নিরীহ উদ্দীপকে সাড়া কমে যাওয়া
প্যাভলভের চিরায়ত সাপেক্ষণ: ঘণ্টাধ্বনি→লালা
নিরপেক্ষ উদ্দীপক অভিজ্ঞতায় সাড়া-উদ্রেককারী হয়
পরীক্ষায় যেভাবে আসে
প্যাভলভের সাপেক্ষণে ঘণ্টাধ্বনি (নিরপেক্ষ) খাবারের সাথে যুক্ত হয়ে সাপেক্ষ উদ্দীপক হয় — এটি শিখন, সহজাত নয়।
এখানে ভুল হয় (৩)
- ·সাপেক্ষণকে সহজাত আচরণ ভাবা — শিখন আচরণ
- ·অভ্যাসগতকরণকে সাড়া-বৃদ্ধি ভাবা — সাড়া হ্রাস
- ·প্যাভলভের লালাকে জন্মগত সাপেক্ষ প্রতিবর্ত ভাবা — অর্জিত
প্রাণীর আচরণ
আচরণের প্রকৃতি ও বংশগতির সম্পর্ক
উদ্দীপনার প্রতি কোনো প্রাণীর দৃশ্যমান সাড়া বা প্রতিক্রিয়াকে আচরণ বলে। আচরণ প্রাণীকে পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে টিকে থাকতে, খাদ্য সংগ্রহে, শত্রু এড়াতে ও বংশবৃদ্ধিতে সাহায্য করে। মূলত আচরণ দুই ধরনের: সহজাত আচরণ (জন্মগত, বংশগতভাবে নির্ধারিত, শেখার প্রয়োজন নেই) এবং শিখন আচরণ (অভিজ্ঞতা ও পরিবেশ থেকে অর্জিত)। আচরণের ভিত্তি বংশগতিতে নিহিত — জিন স্নায়ুতন্ত্র ও হরমোনের মাধ্যমে আচরণের কাঠামো নির্ধারণ করে, তবে পরিবেশ ও শিখন সেই কাঠামোকে পরিবর্তিত করতে পারে। তাই আচরণ বংশগতি ও পরিবেশ — উভয়ের মিথস্ক্রিয়ার ফল।
আচরণ = উদ্দীপনার প্রতি প্রাণীর সাড়া
দুই ধরন: সহজাত (জন্মগত) ও শিখন (অর্জিত)
জিন স্নায়ু-হরমোনের মাধ্যমে আচরণ নির্ধারণ করে
আচরণ = বংশগতি + পরিবেশের মিথস্ক্রিয়া
পরীক্ষায় যেভাবে আসে
সহজাত আচরণ শেখার প্রয়োজন নেই (জন্মগত), শিখন আচরণ অভিজ্ঞতা-নির্ভর — মূল বিভাজন। আচরণের ভিত্তি বংশগতি।
এখানে ভুল হয় (৩)
- ·সব আচরণকে শিখন-নির্ভর ভাবা — সহজাত আচরণ জন্মগত
- ·আচরণকে শুধু পরিবেশজাত ভাবা — বংশগতিও ভিত্তি
- ·সহজাত আচরণকে অভিজ্ঞতা-নির্ভর ভাবা — জন্মগত
প্রাণীর আচরণ
সহজাত আচরণ: প্রতিবর্তী ক্রিয়া
প্রতিবর্তী ক্রিয়া হলো উদ্দীপনার প্রতি দেহের দ্রুত, স্বয়ংক্রিয় ও অনিচ্ছাকৃত সহজাত সাড়া, যা প্রধানত সুষুম্নাকাণ্ড (কিছু ক্ষেত্রে যেমন হাঁচি ও চোখের পলকে মস্তিষ্ককাণ্ড) দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয় — গুরুমস্তিষ্কের সচেতন সিদ্ধান্ত ছাড়াই। এই ক্রিয়ার স্নায়ুপথকে প্রতিবর্ত চক্র বা রিফ্লেক্স আর্ক বলে: রিসেপ্টর→সংবেদী নিউরন→সুষুম্নাকাণ্ড→চেষ্টীয় নিউরন→ইফেক্টর। প্রতিবর্ত ক্রিয়া দুই ধরনের: সহজাত প্রতিবর্ত (জন্মগত, যেমন হাঁচি, চোখের পলক, গরমে হাত সরানো) ও অর্জিত/সাপেক্ষ প্রতিবর্ত (অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠা, যেমন খাবার দেখে লালা)। প্রতিবর্ত ক্রিয়া দ্রুত হওয়ায় বিপদ থেকে তাৎক্ষণিক রক্ষা করে।
প্রতিবর্তী ক্রিয়া দ্রুত, স্বয়ংক্রিয়, প্রধানত সুষুম্নাকাণ্ড-নিয়ন্ত্রিত
রিফ্লেক্স আর্ক: রিসেপ্টর→সংবেদী→সুষুম্নাকাণ্ড→চেষ্টীয়→ইফেক্টর
সহজাত প্রতিবর্ত (হাঁচি, পলক) ও অর্জিত প্রতিবর্ত
দ্রুত সাড়ায় বিপদ থেকে রক্ষা করে
পরীক্ষায় যেভাবে আসে
প্রতিবর্ত ক্রিয়া গুরুমস্তিষ্কের সচেতন নিয়ন্ত্রণে নয়, প্রধানত সুষুম্নাকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে — তাই দ্রুত। সহজাত ও অর্জিত দুই ধরনের প্রতিবর্ত আছে।
এখানে ভুল হয় (৩)
- ·প্রতিবর্ত ক্রিয়াকে গুরুমস্তিষ্কের সচেতন নিয়ন্ত্রণাধীন ভাবা — প্রধানত সুষুম্নাকাণ্ড
- ·সব প্রতিবর্তকে সহজাত ভাবা — অর্জিত প্রতিবর্তও আছে
- ·প্রতিবর্ত ক্রিয়াকে ইচ্ছাধীন ভাবা — অনিচ্ছাকৃত
প্রাণীর আচরণ
সহজাত আচরণ: ট্যাক্সিস
ট্যাক্সিস হলো একটি সরল সহজাত আচরণ, যেখানে প্রাণী কোনো উদ্দীপকের উৎসের দিকে বা বিপরীত দিকে নির্দিষ্টভাবে সরাসরি চলাচল করে। উদ্দীপকের প্রকৃতি অনুসারে বিভিন্ন প্রকার: ফটোট্যাক্সিস (আলোর প্রতি — যেমন পতঙ্গের আলোর দিকে ছুটে যাওয়া), কেমোট্যাক্সিস (রাসায়নিকের প্রতি), থার্মোট্যাক্সিস (তাপের প্রতি), হাইড্রোট্যাক্সিস (পানির প্রতি) ইত্যাদি। উৎসের দিকে গেলে ধনাত্মক (positive) ও বিপরীতে গেলে ঋণাত্মক (negative) ট্যাক্সিস। ট্যাক্সিস প্রাণীকে অনুকূল পরিবেশ খুঁজে নিতে ও প্রতিকূল পরিবেশ এড়াতে সাহায্য করে, তাই এর অভিযোজনিক গুরুত্ব আছে।
ট্যাক্সিস = উদ্দীপকের দিকে/বিপরীতে সরাসরি সহজাত চলন
প্রকার: ফটো-/কেমো-/থার্মো-/হাইড্রো-ট্যাক্সিস
উৎসের দিকে = ধনাত্মক, বিপরীতে = ঋণাত্মক
অভিযোজনিক গুরুত্ব: অনুকূল পরিবেশ খোঁজা
পরীক্ষায় যেভাবে আসে
উদ্দীপকের নাম দিয়ে ট্যাক্সিসের নাম হয় (আলো=ফটোট্যাক্সিস)। উৎসের দিকে গেলে ধনাত্মক — দিক দিয়ে ধনাত্মক/ঋণাত্মক নির্ধারিত।
এখানে ভুল হয় (৩)
- ·ট্যাক্সিসকে শিখন আচরণ ভাবা — সহজাত
- ·ফটোট্যাক্সিসকে রাসায়নিক-সাড়া ভাবা — আলোর সাড়া
- ·সব ট্যাক্সিসকে ধনাত্মক ভাবা — ঋণাত্মকও হয়